ইন্টারনেটের অজানা জগৎ: সারফেস, ডিপ, ডার্ক ওয়েব এবং Tor এর আসল ইতিহাস!

ইন্টারনেটকে যদি আমরা একটি বিশাল মহাসাগরে ভাসমান বরফখণ্ডের (Iceberg) সাথে তুলনা করি, তবে আমরা এর যতটুকু অংশ দেখতে পাই, পানির নিচে তার চেয়ে বহুগুণ বিশাল একটি জগৎ লুকিয়ে আছে। আসুন জেনে নিই ইন্টারনেটের সেই অজানা স্তরগুলো এবং এর পেছনের ইতিহাস সম্পর্কে।

১. সারফেস ওয়েব (Surface Web) - দৃশ্যমান ইন্টারনেট ইন্টারনেটের যে অংশটি আমরা প্রতিদিন ব্যবহার করি এবং যা Google, Bing বা Yahoo-এর মতো সার্চ ইঞ্জিনগুলো সহজেই খুঁজে পায় (Index করতে পারে), তাকে সারফেস ওয়েব বলে। Facebook, YouTube, Instagram বা যেকোনো সাধারণ ওয়েবসাইট এর অংশ। আমাদের কাছে এই অংশটি অনেক বিশাল মনে হলেও, এটি পুরো ইন্টারনেটের মাত্র ৪% থেকে ৫% জায়গা দখল করে আছে!

২. ডিপ ওয়েব (Deep Web) - লুকানো কিন্তু প্রয়োজনীয় অংশ অনেকেই ভাবেন ডিপ ওয়েব মানেই খুব ভয়ঙ্কর বা রহস্যজনক কিছু। কিন্তু বাস্তব হলো, ডিপ ওয়েবে বেআইনি বা রহস্যজনক কিছু নেই। ইন্টারনেটের যে বিশাল অংশটি সার্চ ইঞ্জিনগুলো দেখতে বা ট্র্যাক করতে পারে না, সেটিই হলো ডিপ ওয়েব। এখানে মূলত সিকিউরিটি এবং প্রাইভেসি দিয়ে সুরক্ষিত ডেটা থাকে। যেমন: আপনার ইমেইল ইনবক্স, সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টের ভেতরের মেসেজ, অনলাইন ব্যাংকিংয়ের তথ্য, মেডিকেল রেকর্ড, লিগ্যাল ডকুমেন্টস, প্রাইভেট ডেটা ইত্যাদি।

উদাহরণ: ধরুন, আপনি রকমারি বা কোনো ই-কমার্স সাইটে একটি নির্দিষ্ট বই খুঁজছেন। গুগলে সার্চ করে হয়তো বইটি পেলেন না। কিন্তু আপনি যখন সরাসরি সেই ওয়েবসাইটের নিজস্ব সার্চ বারে খুঁজবেন, তখন বইটি পেয়ে যাবেন। এই যে ওয়েবসাইটের নিজস্ব ডেটাবেস থেকে তথ্যটি বের করলেন—আপনি মূলত তখন ডিপ ওয়েবের একটি অংশ অ্যাক্সেস করলেন! পুরো ইন্টারনেটের প্রায় ৯০% থেকে ৯৫% জুড়েই রয়েছে এই ডিপ ওয়েব।

৩. ডার্ক ওয়েব (Dark Web) - অন্ধকারের জগৎ ডার্ক ওয়েব হলো ডিপ ওয়েবেরই একটি ছোট্ট অংশ (ইন্টারনেটের ১% এরও কম), যা সাধারণ ব্রাউজার দিয়ে অ্যাক্সেস করা যায় না। এটিতে প্রবেশ করার জন্য বিশেষ ব্রাউজার বা নেটওয়ার্কের প্রয়োজন হয়।

Tor (The Onion Router) এর উৎপত্তি: এটি কেন তৈরি হয়েছিল? ইন্টারনেটের শুরুর দিকে মানুষ নিজেদের ডেটা নিয়ে খুব একটা সচেতন ছিল না এবং ইন্টারনেটে ‘অ্যানোনিমিটি’ বলতে কিছু ছিল না। ১৯৯৫ সালে ইউএস নেভাল রিসার্চ ল্যাবরেটরি (USA NRL)-এর গবেষকদের মাথায় একটি চিন্তা আসে—মার্কিন গুপ্তচর এবং সামরিক বাহিনীর নিরাপদ যোগাযোগের জন্য এমন একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করা, যেখানে কেউ জানতে পারবে না কে কার সাথে যোগাযোগ করছে এবং কেউ সেটা মনিটরও করতে পারবে না।

এর বেসিক আইডিয়া হলো, ইন্টারনেটের ট্রাফিক সরাসরি এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় না পাঠিয়ে, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা একাধিক সার্ভারের ভেতর দিয়ে পাঠানো। ডেটাগুলো প্রতিটি সার্ভারে আলাদা আলাদা এনক্রিপশন (Encryption) এর চাদরে মোড়ানো থাকে, ঠিক পেঁয়াজের স্তরের মতো। এই প্রজেক্টটির নামই ছিল The Onion Routing Project, যা আজ সংক্ষেপে Tor নামে পরিচিত।

গোপন প্রজেক্ট কেন সবার জন্য উন্মুক্ত করা হলো? অনেকেই ভাবেন Tor বুঝি সাধারণ মানুষের প্রাইভেসির কথা ভেবে তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু এটি মূলত ইউএস ইন্টেলিজেন্স বা সিক্রেট এজেন্সিগুলোর জন্য বানানো হয়েছিল। তবে সমস্যা হলো, যদি শুধু ইউএস গভমেন্ট Tor ব্যবহার করত, তবে ওয়েবসাইটের মালিকরা সহজেই বুঝে যেত যে কানেকশনটি আমেরিকান ইন্টেলিজেন্সের। তাই নিজেদের গুপ্তচরদের সাধারণ মানুষের ভিড়ে লুকিয়ে ফেলার জন্য Tor কে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। যখন সারা বিশ্বের মানুষ প্রাইভেসির জন্য এটি ব্যবহার করা শুরু করল, তখন সেই কোটি কোটি সাধারণ ট্রাফিকের ভিড়ে ইউএস এজেন্সির লোকরাও নিজেদের লুকিয়ে রাখতে সক্ষম হলো। বর্তমানে Tor ছাড়াও I2P, Freenet, Tails এর মতো সিস্টেম নিয়ে ডার্ক ওয়েব গঠিত।

ইন্টারনেটের ৭টি স্তরের ধারণা: সত্য নাকি মিথ? ইন্টারনেটে প্রায়ই শোনা যায় এর ৭টি বা ৮টি স্তর আছে (যেমন: Bergie web, Charter web, Marianas web, Fog/virus soup, Primarch system ইত্যাদি)।

বাস্তব সত্য হলো, সাইবার সিকিউরিটি বা প্রযুক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে এটি সম্পূর্ণ একটি ইন্টারনেট মিথ বা আরবান লিজেন্ড (Urban Legend)। কয়েক বছর আগে রেডিট (Reddit) এবং 4chan-এর মতো ফোরামগুলোতে কিছু মানুষ কল্পনার ভিত্তিতে এই স্তরগুলোর গল্প বানিয়েছিল, যা পরবর্তীতে ভৌতিক গল্প হিসেবে ভাইরাল হয়ে যায়। বাস্তবে প্রযুক্তিগতভাবে ইন্টারনেটের কেবল ঐ তিনটি ভাগই (Surface, Deep, Dark) স্বীকৃত এবং অস্তিত্বশীল।