🧅 Tor (The Onion Router): কীভাবে এবং কেন তৈরি হয়েছিল?
ইন্টারনেটের শুরুর দিকের কথা: যখন প্রাইভেসি বলে কিছু ছিল না ইন্টারনেটের শুরুর দিকে ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল বেশ কম। সেই সময় মানুষ নিজেদের ডেটা বা তথ্য নিয়ে খুব একটা সচেতন ছিল না। কারণ তখন সাইবার সিকিউরিটি বা প্রাইভেসি নিয়ে কারও তেমন মাথাঘামানোর প্রয়োজন পড়ত না এবং ইন্টারনেটে ‘অ্যানোনিমিটি’ (নিজের পরিচয় গোপন রাখা) বলতে কিছু ছিল না। ফলস্বরূপ, ইন্টারনেটে কে কী করছে, তা ট্র্যাক (Track) করা বা নজরদারি করা অত্যন্ত সহজ ছিল।
ইউএস নেভাল রিসার্চ ল্যাবরেটরি (NRL) এর যুগান্তকারী চিন্তা ১৯৯৫ সালের কথা। সাধারণ মানুষ সচেতন না হলেও, ইউএস নেভাল রিসার্চ ল্যাবরেটরি (USA NRL) এর গবেষকদের চিন্তার বিষয় ছিল ভিন্ন। মার্কিন গুপ্তচর এবং সামরিক বাহিনীর নিরাপদ যোগাযোগের জন্য এমন একটি ইন্টারনেট কানেকশন বা নেটওয়ার্ক তৈরি করার প্রয়োজন দেখা দেয়, যেখানে:
- কেউ জানতে পারবে না কে কার সাথে যোগাযোগ করছে।
- কেউ চাইলেও সেই যোগাযোগ মনিটর বা নজরদারি করতে পারবে না।
এই সমস্যার সমাধান খুঁজতে গিয়েই গবেষকদের মাথায় একটি অসাধারণ আইডিয়া আসে—যার নাম দেওয়া হয় “The Onion Routing”।
অনিয়ন রাউটিং (Onion Routing) আসলে কী? এর বেসিক আইডিয়া হলো, ইন্টারনেটের ট্রাফিক বা ডেটা সরাসরি এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় না পাঠিয়ে, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা একাধিক সার্ভারের (নোড) ভেতর দিয়ে পাঠানো।
- পেঁয়াজের মতো স্তর: ডেটাগুলো প্রতিটি সার্ভারে আলাদা আলাদা এনক্রিপশন (Encryption) বা নিরাপত্তার চাদরে মোড়ানো থাকে, ঠিক যেমন পেঁয়াজের অনেকগুলো খোসা বা স্তর থাকে।
- এই প্রজেক্টটির নামই ছিল The Onion Routing Project, যা আজ সংক্ষেপে Tor (টর) নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিত।
কেন গোপন এই প্রজেক্ট সবার জন্য উন্মুক্ত করা হলো? অনেকেই ভাবেন Tor বুঝি সাধারণ মানুষের প্রাইভেসির কথা ভেবে তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, এটি মূলত ইউএস ইন্টেলিজেন্স বা সিক্রেট এজেন্সিগুলোর গোপন যোগাযোগের জন্যই বানানো হয়েছিল। তাহলে প্রশ্ন হলো, এটি সবার জন্য উন্মুক্ত করা হলো কেন?
এর পেছনে একটি দারুণ কৌশল বা বাধ্যবাধকতা ছিল। সাইবার দুনিয়ায় একটি কথা প্রচলিত আছে— “Anonymity loves company” (পরিচয় গোপন রাখার জন্য ভিড়ের প্রয়োজন)।
- সমস্যা: যদি শুধুমাত্র ইউএস গভমেন্ট বা সিক্রেট এজেন্সি Tor ব্যবহার করত, তবে যখনই কোনো ওয়েবসাইটের মালিক বা হ্যাকার দেখত যে Tor নেটওয়ার্ক থেকে কোনো কানেকশন আসছে, তারা সহজেই বুঝে যেত যে এটা নিশ্চিতভাবেই আমেরিকান ইন্টেলিজেন্সের কেউ।
- সমাধান: ইন্টেলিজেন্সের লোকদের সাধারণ মানুষের ভিড়ে লুকিয়ে ফেলার জন্য Tor কে সবার জন্য উন্মুক্ত বা Open Source করে দেওয়া হয়। যখন সারা বিশ্বের সাংবাদিক, অ্যাক্টিভিস্ট থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ প্রাইভেসির জন্য Tor ব্যবহার করতে শুরু করল, তখন সেই কোটি কোটি সাধারণ ট্রাফিকের ভিড়ে ইউএস এজেন্সির লোকরাও সহজেই নিজেদের লুকিয়ে রাখতে সক্ষম হলো।
ডার্ক ওয়েব (Dark Web) এর সূচনা Tor নেটওয়ার্ক সবার জন্য উন্মুক্ত হওয়ার পর ইন্টারনেট জগতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। বর্তমানে শুধু Tor নয়, পরিচয় গোপন রেখে ইন্টারনেট ব্রাউজ করার জন্য আরও বেশ কিছু নেটওয়ার্ক ও অপারেটিং সিস্টেম তৈরি হয়েছে। যেমন:
- I2P (Invisible Internet Project): এটিও একটি এনক্রিপ্টেড নেটওয়ার্ক লেয়ার।
- Freenet: সেন্সরশিপ প্রতিরোধে তৈরি পিয়ার-টু-পিয়ার প্ল্যাটফর্ম।
- Tails: একটি সিকিউর অপারেটিং সিস্টেম যা পিসি-তে কোনো আলামত না রেখেই কাজ করতে সাহায্য করে।
এই ধরনের সব সিকিউর ও হিডেন নেটওয়ার্কগুলো মিলেই মূলত ইন্টারনেটের সেই অন্ধকার বা গোপন অংশটি তৈরি হয়েছে, যাকে আমরা Dark Web বা ডার্ক নেট বলে থাকি।